![]() |
| লেখিকা: জাহান সৈয়দ |
সূর্য্য অস্ত যাবার বেশ কিছু আগে, আমি প্রায় প্রতিদিনই হাটতে বেরোই। গরমের দিনে এই সময়টাই আমার ভালো লাগে হাটতে। রোদের তেজ তখন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে। অন্টারিও লেকের গা ছুঁয়ে আসা মৃদুমন্দ বাতাস, আর রৌদ্র ছায়ার লুকোচুরিতে বেশ লাগে হাটতে আমার।আমাদের শহরটার নাম ওকভীল। এই শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বিশাল অন্টারিও লেক। আমাদের বাড়িটা এই লেক থেকে বেশ কাছেই বলা চলে। ইচ্ছে করলে হেটেই যাওয়া যায় লেকের পাড়ে।
বিকেলের মিষ্টি নরম রোদ গায়ে মেখে, হাটতে হাটতে আমি দুনয়নের দৃষ্টিতে গাঁথি, আমার চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে। নিঃশ্বাসে পাই শুদ্ধ পরিচ্ছন্ন সুগন্ধ। থমকে দাঁড়াই কোথাও প্রান ভরে ফুলের সুবাস নিতে, কখনো বুনো ফুলের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে, আবার কখনো এইসব দৃষ্টিনন্দন ছবি আমার ফোন ক্যামেরায় বন্দী করে নিতে! সদ্য ঘাস কাটার এক ভালো লাগা গন্ধ ভেসে আসে বাতাসে। কখনো আসে বারবাকিউ থেকে ঝলসানো খাবারের সুগন্ধ। সাপারের আয়োজনে গোটা পরিবারের কথোপকথন ও হাসি আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে কারো কারো ব্যাকইয়ার্ড। কোথাও হয়তো বা ড্রায়ার থেকে আসছে শুকনো কাপড়ের আউটডোর ফ্রেশ গন্ধ। কোথাও কোথাও স্প্রিঙ্কলারে পানি দেয়া হচ্ছে বাগানে ও ঘাসে। ছোট বড় ছেলে মেয়েরা বাইক (সাইকেল) চালাচ্ছে, কেউ কেউ আবার ড্রাইভওয়েতে বাস্কেটবল খেলায় ব্যাস্ত। নতুন বাবা-মায়ের ছোট্ট শিশুটিকে বেবি ক্যারেজে নিয়ে বেড়াতে বেরোনো, যুবক যুবতীদের জগিং, কুকুরকে হাটানো, আবার পরিনত বয়সের যুগলদের হাত ধরাধরি করে বৈকালিক ভ্রমণ। পরিচিত কাউকে পেলে দুদন্ড দাঁড়িয়ে একটু হাই হ্যালো, সৌজন্যতায় কুশল বিনিময়। এই সব কিছুই চলছে, তবে কোভিডের জন্য সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে।
মাঝে মধ্যে দু একটা গাড়ী হুস করে চলে যায় কালো পিচঢালা পথ বেয়ে। কাঠবেড়ালিরা ছুটোছুটি করে, বুঝিবা খাবারের খোঁজে। সরসর করে এগাছে ওগাছে ওঠা নামা করে। হঠাৎ দৌড়ে ত্বরিত গতিতে পথের এপার থেকে ওপারে চলে যায়। খরগোশেরা উঁকিঝুঁকি দেয়। ফুলের বাগানের আনাচে কানাচে গোপীদের সাথে রাশ লীলা করে। আবার কখনো দেখা যায়, পরিবার পরিজন নিয়ে সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে আলোচনায় নিমগ্ন। বিষয়বস্তু? এবারে কোন বাগানটার সর্বনাশ করলে রসনায় সুখ হবে দারুণ! মাঝে মধ্যে দেখি দু একটা বড় পাখি ও (টার্কি?) নির্ভয়ে বিচরণ করছে। প্রতিবেশীর বাগানে, ঘাসের মাঝে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। নয়তো চুপটি করে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। মজার ব্যাপার হোলো এই কাঠবেড়ালী, খরগোশ আর বড় পাখি, এরা পথচারীদের সাথে এই প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেদেরকে এত সুন্দর করে মানিয়ে নিয়েছে যে দেখে অবাক হতে হয়! নির্ভয়ে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে যেন কোনই চিন্তা ভাবনা নেই এদের!
সকালের মিষ্টি রোদ আর বিকেলের মিষ্টি নরম রোদে একটা পার্থক্য আছে। সকালের রোদ যেমন ঝলমল করে পৃথিবীকে উদ্যমী করে তোলে, তেমনি বিকেলের রোদ স্তিমিত হয়ে ধীরে ধীরে নরম মেজাজে হালকা রক্তিম আভা ছড়িয়ে বিদায় নেয়। এই সময় প্রকৃতিকে দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। ঘাস, ফুল,পাতা সব কিছু যেন অন্য রংগে বিকশিত হয়ে যায়। পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদের খেলা, আর সবুজ ঘাসে গাছের ছায়ার আলপনা কি যে সুন্দর তা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। জাপানি-মেপল গাছে যখন বিকেলের রোদ পড়ে, তখন তার মেরুন পাতাগুলো ঠিক যেন লক্ষ রুবির মত ঝলমল করে ওঠে। সেখান থেকে দৃষ্টি ফেরানো দুঃসাধ্য হয়ে যায়।
আমাদের ওকভীলে অনেক সুন্দর সুন্দর ট্রেইলস আছে। গাছ গাছালীতে ঘেরা এই বুনো পথগুলোতে একা যাবার সাহস আমার কখনো হয়নি। তবে সঙ্গী সাথী নিয়ে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। বনের মাঝে পায়ে হাটা মেঠো পথ, ঝোপঝাড়, নাম না জানা বড় বড় পুরনো গাছ, আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে বুনো ফুলের সমারোহ, বুনো আপেল, পেয়ার (নাসপাতি) নানা রকমের বেরী আরো কত কি। মনে পড়ে, একবার সেই সব পেড়ে কোঁচড় ভরে এনে আচার চাটনি ও বানিয়েছিলাম। আমার রোজকার হাটার পথে বেশ কিছু ট্রেইলস পড়ে। অদম্য ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও একা ঢুকতে পারিনা সেখানে। তাই সবসময়ই মনের মাঝে একটা অপূর্ণতার রেশ রয়ে যায়।
এমনি করে এক সময় এই পড়ন্ত বিকেল আকাশের গায়ে গোধূলির রাংঙা আবীর ছড়িয়ে সন্ধ্যার কোলে ঢলে পড়ার আয়োজন করে। রঙ বেরঙের পাখিদের ঘরে ফেরার কলকাকলীতে মুখর হয়ে ওঠে সন্ধ্যা। সেই সাথে আমার ও ঘরে ফেরার সময় হয়ে আসে। খোলা আকাশের নীচে অবাধ মুক্ত হাওয়ায় প্রফুল্লচিত্তে প্রকৃতির বায়েস্কোপ দেখে এসে আমি ভেবে অবাক হই বিধাতা কি অপার সৃজনশীলতা দিয়ে, কত মনোরম করে সাজিয়েছেন এই ধরণী!






