মোহাম্মদ তৌহিদ : এটা খনার বচন নয়, এটা সত্য কথন। বহির্বিশ্ব থেকে শুরু করে তাবৎ মহলে এটাই প্রযোজ্য। অভিজ্ঞ মাত্রই জানেন এ কথা। ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাত নির্বিশেষে এ বাক্যের চেতনা সত্য বলে প্রমাণিত। যিনি এ কম্ম করেন, তিনি নিজেও তা জানেন। কিন্তু তারই উন্মুক্ত চর্চা খোলা চোখে দেখা যায়। যা খুবই দুঃখজনক!

‘পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করাতে’ আমজনতার জন্য ২০১৪ সালেদেশেরএকটি পত্রিকা একটি উদ্যোগ নেয়। তা হলো, বিভিন্ন ইস্যুতে ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের’ বিশ্লেষণমূলক লেখাগুলোর অনুবাদ তুলে ধরা। মহতি উদ্যোগ; সন্দেহ নেই। তা নাহলে জানাই যেত না- কে, কাকে কত ঘৃণা করে; ঘৃণা ছড়ানোর উপায়গুলোই বা কী কী!

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের একটি লেখা ভীষণ আন্তরিকতার সঙ্গে অনুবাদ করলেন ভারত সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা জনাব অরবিন্দ সুব্রামানিয়াম। ভদ্রলোক বর্তমানে হরিয়ানার অশোক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। তাঁর অনুবাদে আমজনতাকে ব্যাপকভাবে বোঝানো হলো, চীন কী কী কারণে গোটা বিশ্বে থেকে ছিটকে পড়েছে! (আসলে কি তাই?) অর্থাৎ, ধরেই নেওয়া হলো যে, কোভিড-১৯ ইস্যুতে ইতোমধ্যে বেইজিং পরাজিত হয়ে গোটা বিশ্ব থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেসামাল হয়ে টলতে টলতে ডোবার মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে!

এইখানে আমজনতার একটা প্রশ্ন হলো, সুবোধ বাঙ্গালি চীনের পক্ষে থাকলে কার কার ক্ষতি, আর বিপক্ষে গেলে কার-কী লাভ? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনার-আমার কোন পক্ষ অবলম্বন করা উচিত?

আমেরিকার ? চীনের ? নাকি সত্যের ?

উত্তরটা আপনি-আমি সবাই জানি। শুধু মুখ ফুটে বলি না;

কারণ? যদি ‘পাছে লোকে কিছু বলে!’

যুগে যুগে দুর্বলের ওই একটাই ভয়। পাছে সম্মান নিয়ে টান দেয় কেউ! তাহলেই তো সব গেল! যেভাবে আমাদের ‘কান নিয়ে যায় চিলে’ আর ‘আমরাও ছুটি দলে দলে।’

সে যাই হোক, গোটা প্রবন্ধে (ব্যাপক কুযুক্তি দিয়ে ও প্রকাশ্যে মিথ্যাচার করে) চীনের বেশ কিছু ইতিবাচক কাজকে নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হলো (আর এটাই হলো ঘৃণা ছড়ানোর অন্যতম একটি কৌশল)। সত্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো, যাতে তা মিথ্যার মতোই নোংরা মনে হয়।

অনুবাদের অসংখ্য অসঙ্গতি ও অভিযোগের মধ্যে থেকে কয়েকটি উল্লেখ করছি।

১.  বিভিন্ন দেশকে ঋণ দিয়ে তা পরিশোধ নিয়ে অদ্ভুত আপত্তি!

২. চীনের বাজারে বিভিন্ন দেশের ব্যবসা করার সুযোগ !

৩. হংকং, তাইওয়ান, সিনচিয়াং, লাদাখ ইস্যুকে সামনে এনে চীনের তথাকথিত ‘বিদেশি আগ্রাসন’ প্রমাণের চেষ্টা!

 

১.

সিন্ডিকেটে বলা হলো, “অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় চীন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সর্বোচ্চ মেয়াদে পরিশোধযোগ্য ঋণ দিয়ে থাকে। এই কোভিড মহামারির মধ্যে কিস্তির অর্থ পরিশোধের বিষয়টি তারা স্থগিত রাখতে পারত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা আবার কিস্তির অর্থ নেওয়া শুরু করতে পারত।”

এটি পড়ামাত্রই দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি মানুষের দেশটির বিরুদ্ধে পাঠকের একরকম নেতিবাচক ছবি মাথায় ভেসে উঠবে (আসলে লক্ষ্য তো সেটাই!)। বাস্তবতা হলো, “সর্বোচ্চ মেয়াদে পরিশোধযোগ্য ঋণ দেওয়া” তো সর্বোচ্চ সুবিধা! বিগত কয়েক মাসে চীন সরকার প্রতিবেশী দেশ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো খাতে দেওয়া ঋণের কিস্তি স্থগিতের ঘোষণা বহু আগেই দিয়েছে। যেহেতু চীন অনেক দীর্ঘমেয়াদে ঋণ মওকুফের সুযোগ দিয়ে থাকে, যা আমার দেশের মতো অন্যদের জন্য অনেক বেশি উপকারী, তাই তার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য ভাষার ওই মারপ্যাঁচ বেছে নেওয়া হলো। বলতেই হয়, অনুবাদে ঘৃণা ও বিদ্বেষ একেবারে শতধারায় বিকশিত হচ্ছে!

 

২.

বলা হলো, চীন “উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শর্তহীন স্বল্পমেয়াদী ঋণ দিতে পারত। করোনায় আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত গরীব দেশগুলোকে বিনা শুল্কে তাদের বাজারে ঢোকার সুযোগ দিতে পারত। কোভিড-সংক্রমিত দেশগুলোকে চীন ফেস মাস্ক, টেস্টিং কিট, সুরক্ষা সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর—এসব স্বাস্থ্য উপকরণ সরবরাহ করতে পারত। বিশেষ করে তারা কম দামে এগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে সরবরাহ করার ঘোষণা দিতে পারত।”

এই যে এতসব অভিযোগ, পড়লে যে কারও চোখে-মুখে চীনবিরোধী দ্রোহের আগুন জ্বলে উঠবে। অথচ চীন তাই করেছে, যা করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হলো! কী জঘন্য অপকৌশল!

যেমন, আপনি কাউকে সহায়তা দিলেন। তা দেখে যার ঘুম হারাম হয়ে গেলো, সে এবার বলে বেড়ালো যে- ‘এ দুর্দিনে আপনি কিছু দান করতে পারতেন।” অর্থাত্, একই সঙ্গে আপনার দানকে অস্বীকার করা এবং আপনাকে ওই ভালো কাজ করতে না পারার মতো ‘ছোটলোক’ প্রমাণ করে ছাড়া! ‘এক ঢিলে দুই পাখির’ মতো। আসলে দুই পাখি নয়— এক মিথ্যা দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে সত্য অস্বীকার করা হলো!

সত্য হলো, বিগত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মুসলিম দেশ ও অনুন্নত দেশগুলোকে মহামারি মোকাবিলার ব্যাপক পণ্য কেনার জন্য রাজনৈতিক চাপমুক্ত ঋণ দেওয়ার কথা বলছে চীন। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশকে দফায় দফায় ফেস মাস্ক, টেস্টিং কিট, সুরক্ষা সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর বিনামূল্যে দিয়ে আসছে! এসব কেনার সুযোগও করে দিয়েছে দেশটি। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে কোটি কোটি ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছে ও দিচ্ছে বেইজিং।

তারপরও একটি দেশকে এসব বিষয়ে অভিযোগ কীভাবে করা যায়?

চীন তো জাতিসংঘ নয়, যুক্তরাষ্ট্রও নয় ! তারপরও দুই শতাধিক দেশে চীন যে ধারাবাহিক ও বিনামূল্য সহায়তা দিয়ে আসছে সেজন্য ধন্যবাদ জানানোর মতো উদারতা/বিনয় কি মানুষের হবে না !!

তবে, আমজনতা অনেকেই কৃতজ্ঞ। কিন্তু, সে কথা প্রকাশ করা যায় না; যদি, ‘পাছে কিছু বলে বসে কেউ!’

 

৩.

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে বলা হলো, “জিনজিয়াং, তিব্বত, তাইওয়ান, হংকংয়ে সে তার খবরদারি আরও কঠোর করেছে।......চীনের যখন আরও উদার হয়ে কাজ করার কথা, তখন সে কেন আগ্রাসী হয়ে উঠছে”!!

চরম বিস্ময়কর নয় কী! পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের যে কোনও কার্যক্রম একান্তই যেমন আমার দেশের বিষয়; ঠিক তেমনি হংকং, তাইওয়ান, সিনচিয়াং ইস্যুতে চীন যা করছে তা একান্তই চীনের বিষয়। ওই সব অঞ্চলে চীনের কার্যক্রম বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের সুযোগ আছে। কিন্তু এটি কীভাবে অন্য দেশে চীনের আগ্রাসন প্রমাণ করে? কিংবা লাদাখ সীমান্ত অঞ্চলে চীন-ভারত সহিংসতা নিয়ে যাই হোক না কেন, তা কি অন্য দেশে চীনের আগ্রাসন প্রমাণ করে?

ও সত্য উত্তরগুলো আমজনতার মনে গুণ-গুণিয়ে ওঠে; কিন্তু অবলা নারীর মতো ‘বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না’।